Valobaser Golpo – ও আমায় ভালোবাসেনি (সিজন ২)

লেখাঃ সিনিন তাসনিম সার
— আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ফয়সাল ভাই।
— হ্যাঁ শুনেছি । মা বললো কাল । ছেলে নাকি সেনাবাহিনীতে আছে?
— হু কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই না ।- Valobaser Golpo
— কেনো?
— আপনি জানেন না কেনো?
— এসব পাগলামি বাদ দাও মিথি । ছেলের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি আমি । অনেক ভালো ছেলে , ফ্যামিলি স্ট্যাটাসও হাই ।
— আপনি বুঝতে পারছেন না আপনাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না!
— এসব তোমার আবেগ । আবেগের বসে বলছো..
— সারা দুনিয়ার মানুষ জানে আমি আপনাকে ভালোবাসি আর আপনার কাছে এটা আবেগ মনে হয়?
উত্তরে মুচকি একটা হাসি দিলো ফয়সাল ।

— মিথি আমার বাবা মায়ের লাভ ম্যারেজ । আবেগে পড়ে খুব কম বয়সে মা বাবার হাত ধরে পালিয়ে এসেছিলো ঢাকা শহরে । খুব কষ্ট করে সংসার চালাতো বাবা কিন্তু সুখ ছিলো আমাদের সংসারে ।- valobaser golpo
যখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি তখন হঠাৎ বাবা মারা যায় । বাবা মারা যাওয়ায় তো চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি আমরা , টাকা আসার আ্যাসেট নেই । অভুক্ত থাকতে হয় । আমরা যখন দুশ্চিন্তায় দিন পার করছি তখন হঠাৎ কোথা থেকে আমাদের দায়িত্ব নিতে চলে এলো আমার বড় খালারা । আমার মা কে তারা প্রচন্ড ভালোবাসতো যার ফলে ঐ সময়ে আবেগের বশে দায়িত্ব নিয়ে নেয় । কিন্তু অন্য একটা ফ্যামিলি কে স্রেফ আবেগের বশে টানা সম্ভব নয় । টাকা পয়সার কাছে সব সম্পর্ক ফিঁকে । এক বছরের মধ্যেই তা আমরা খুব করে উপলব্ধি করতে পারলাম । খালা-খালু’র আমাদের প্রতি ঐ টান টা আর নেই । আমার মায়ের খুব আত্মসম্মান । টাকার জন্য সম্পর্ক খারাপ করতে সে রাজি নয় । আমাকে নিয়ে বেরিয়ে আসলো ঐ বাড়ি থেকে , মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাবে তবুও কোনো আত্মীয়ের বাসায় নয় ।
তো সেদিন আমরা রাস্তায় রাস্তায় মা ছেলে ঘুরছি স্যুটকেস ভর্তি কাপড় নিয়ে । সকাল গড়িয়ে দুপুর পেটে দানা পানি পড়ে নি । আমি ক্লান্ত হয়ে মা কে বললাম “আমার ক্ষুধা পেয়েছে”

মায়ের হাতে কোনো টাকা ছিলো না । মা তবুও একটা চায়ের দোকানে আমায় নিয়ে গেলো । রুটি আর চা খাওয়ার পর বিল দেয়ার সময় দেখলাম মা তার স্বর্ণের কানের দুল গুলো খুলে দিচ্ছে ।- valobaser golpo
আমি নিষেধ করতে যাবো তার পূর্বেই কেউ একজন মায়ের নাম করে ডাকলো “আরে রাহেলা ভাবী কি করছেন?”
দেখলাম বাবা’র বন্ধু সিকদার চাচা । মা হঠাৎ তাকে দেখে লজ্জায় পড়ে গেলো । হাত গুটিয়ে নিলেও সিকদার চাচা ঠিকই দেখেছিলেন মায়ের হাতে স্বর্ণের কানের দুল গুলো

উনি আমাদের কিছু বলতে না দিয়ে পকেট থেকে টাকা বের করে চা ওয়ালা কে দিলেন এবং আমাদের হাত থেকে লাগেজ নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন_”ভাবী একসময় রাফিউলের জন্য আমার জীবন বেঁচে গেছিলো । আজ আমি বাড়ি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে পারছি স্রেফ ওর কারণে । আমার পরম প্রিয় বন্ধুর বিয়োগের পর তার স্ত্রী সন্তান রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে আর একটা শুকনো রুটির জন্য কানের দুল বেচবে এটা আমি দেখতে পারবো না । আপনি আর বাবু আমার বাসায় উঠবেন চলুন?
মা সাথেসাথেই না করে দেয় কিন্তু উনিও নাছোড়বান্দা , শেষ অবধি আমাদের বাসায় তুললেন । দ্বিতীয় তলায় আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হলো । আমরা সংকীর্ণ গণ্ডিতে থাকতাম সবসময় । মা বুঝিয়ে দিয়েছিল পরের বাড়িতে থাকতে হলে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে , সেগুলো পার করতে নেই ।
আমরা কখনোই সীমাবদ্ধ পার করিনি তবে চাচার পরিবার সীমাবদ্ধতার এই দেয়াল কে ভেঙে দিয়েছিল তক্ষুনি । মায়ের বারণ শুনে চাচা আমায় লেখাপড়া করিয়েছে , আমাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করেছে সবসময় । বিনিময়ে শুধু চেয়েছে তার অন্ধ মেয়েকে যেন বিয়ে করি । ওনারা আমাদের চরম দুঃসময়ে সাহায্য করেছেন তার বদৌলতে ওনাদের এই চাওয়াটা কে অস্বীকার করতে পারিনি ।- Valobaser Golpo

মা তখন কথা দিয়েছিল চাচার মেয়ের সাথেই আমার বিয়ে হবে এবং আমিও মেনে নিয়েছিলাম।
আমি কলেজ লাইফ থেকে টিউশনি কিংবা অন্য উপায়ে উপার্জন করে আলাদা বাসা নিতে চেয়েছি কিন্তু চাচা কখনো দেননি হয়তোবা এই ভয়ে যে ওনাকে করা ওয়াদা ভুলে যাবো! ওনাকে করা প্রতিজ্ঞা যে ভুলে যাই নি তার প্রমাণ দিতেই এখানে থাকতে হলো আমাদের । চারুলতার সাথে সখ্যতা করতে হলো । ও আমায় মাঝেমধ্যে বলতো ওর বাবা’র পাগলামি কথা শুনে যাতে জীবন নষ্ট না করি কিন্তু আমি বা মা কখনো ওসব কানে তুলিনি ।
একটা সময় ঘোর আপত্তি ছিলো বিষয়টা নিয়ে কিন্তু যখন আমি বুঝতে পারলাম চারু আমাকে ভালোবাসে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে কিন্তু নিজের প্রতিবন্ধকতার কারণে কখনো প্রকাশ করতে পারেনা ঠিক তখন আমার মন ওকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করলো ।- Valobaser Golpo
আমার মনে হলো ভালোবাসার জন্য পারফেক্ট হওয়ার দরকার নেই । ওর কেবল দৃষ্টিশক্তি নেই কিন্তু আমাকে ভালোবাসার শক্তি প্রবল ।
আমি কিন্তু নিজ অজান্তেই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি । মিথ্যে বলবো না কিন্তু একটা সময় ভেবেছিলাম এমন জীবন আমার চাই না , পালাতে চেয়েছিলাম ওর থেকে । এজন্য তোমাদের বাসায় উঠেছিলাম । তানভীরের কথায় তোমাকে পড়াতে রাজি হয়েছিলাম । আমার উদ্দেশ্য ছিলো চারু’র থেকে দূরে যাওয়া কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তোমাদের বাসায় একটা রাত শান্তিতে কাটাতে পারিনি । খুব করে বুঝতে পেরেছি আমার সুখ শান্তি ঐ মেয়েটার মধ্যেই। আমি তোমাকে পূর্বেও বলেছিলাম তোমাকে নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ আমার নেই । সময় আছে , নিজের মনের কথা শোনো । আমি স্রেফ তোমার আবেগ একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে ।

— মেয়েটা খুব লাকি ফয়সাল ভাই ।
— উঁহু আমি খুব লাকি ।
— আমি হয়তো আপনাকে কখনো ভুলতে পারবো না তবে আপনাকে কখনো ক্ষমাও করবো না । কেনো ভালোবাসলেন না আমায়! আজকের পর থেকে ঐ মেয়েটাকে নিয়ে কখনো আমার সামনে আসবেন না ফয়সাল ভাই , নিজ অজান্তেই অভিশাপ দিশে ফেলবো হয়তো..
— ভালো থেকো মিথি , অনেক ভালো থেকো । মুচকি হেসে ছাদ থেকে নেমে গেলো ফয়সাল ।- Valobaser Golpo
ক্ষোভে রক্তজবা গাছের টব টা ধাক্কে ফেলে দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো মিথি । ও আজ কাঁদবে ,খুব কাঁদবে । ফয়সাল কি কখনো জানতে পারবে ওর প্রতি মিথির আবেগ নয় ভালোবাসা কাজ করে! সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসে ও ফয়সাল কে ।

অফিস থেকে মাত্র ফিরেছে শব্দ । বিয়ে উপলক্ষে বেশ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে । মা আবার বলেছে হবু বউয়ের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যাকে ইংরেজি তে বলে ডেট করতে । শব্দ এসবে মোটেই কমফোর্টেবল না । মেয়েটার সামনে গেলেই কেমন বুকের ভেতর টা কাঁপতে থাকে , সব কথা গুলিয়ে যায় । তবে মানতে হবে মেয়েটা বেশ সুন্দরী । শ্যামবর্ণের মায়াবতীর ফোলা ফোলা গাল আর ডাগর ডাগর চোখ গুলো সবচাইতে বেশি নজরকাড়া ।
আপন মনে হাসলো শব্দ । কি অদ্ভুত দু’দিন আগে যাকে চিনলো তাকে নিয়ে কত জল্পনা কল্পনা!- Valobaser Golpo
হবু বউয়ের খেয়ালে ডুবে থাকা শব্দ’র চিন্তার জাল বোনা বন্ধ হলো ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে ।
“রাইদ ইনকামিং কল”
স্ক্রিনে ভাসা নামটা দেখে চমৎকার হাসি ফুটে উঠলো শব্দ’র ঠোঁটে । রিসিভ করে উৎফুল্ল হয়ে এঙ্গেজমেন্টের খবর জানালো ।

রাইদ বেশ খুশি হয়ে বললো_
— ভালোই তো । নব বধূর নাম কি?
— মিথিলা । মিথিলা শেখ
— মরহুম মেজর নাদিম শেখে’র মেয়ে?
— হ্যাঁ তুই চিনিস নাকি?
— চিনি তো বেশ ভালো করেই ।- valobaser golpo
— আগে বলিস নি তো!
— ছোটবেলার পরিচিত । বাবা’র কলিগ ছিলো ।
— এখনো নাম মনে আছে?
— তাকে আবার ভোলা যায় নাকি!
— আচ্ছা যাই হোক তুই কিন্তু অবশ্যই আসবি আমার বিয়েতে ।
— আমি না আসলে আবার বিয়ে হয় নাকি!
— ইয়েস । সো কবে আসবি বল?
— আসবো । তোকে সারপ্রাইজ দিতেই আসছি ।
— জলদি আয় অপেক্ষায় আছি আমি ।
— হু আসবো ।
— তোর শুটিং কেমন চলছে?
— বেশ ভালো । তা নব বধূকে দেখাবি না?
— আজ বিকেলে দেখা করতে যাবো । ভিডিও কল দেবো তোকে ।
— দিস । চমকে হার্ট আ্যাটাকই না করে বসে!
— হ্যাঁ তুই এতবড় সেলেব্রেটি কি না!
— ধুর ব্যাটা আমি তোর চাইতে বেশি হ্যান্ডসাম ।
— তা যা বললি হিরো সাহেব ।
দুই বন্ধু হেসে উঠলো।

— আচ্ছা চল বাই । পরে কথা হবে প্রোডিউসারের সাথে মিটিং আছে ।
— ওকে ব্রো ।- valobaser golpo
বন্ধুর সাথে ফোনালাপ শেষে ফোনটা রাখতেই যাবে তক্ষুণি আবার মেসেজ আসলো একটা তাতে লেখা “স্যার visored টিমের হেড এবার দেশে আসছে । মিশন কমপ্লিট করার অর্ডার এসেছে ওপর মহল থেকে । আপনার সাথে মিটিং করতে চাইছে”
শব্দ রিপ্লাই না দিয়ে ফোনটা সুইচড অফ করে রাখলো ।
আলমারি খুলে একটা ব্লু প্রিন্ট , দুটো ল্যাপটপ এবং একটা ক্যামেরা ব্যাগে ভরে একটা গোপন জায়গায় রাখলো । চাবিটা লকেটের ভেতর ঢুকিয়ে লকেট টাতে গাঢ় ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে বললো “এই মিশনের সঙ্গী আজ থেকে তুমিও হয়ে যাবে মিথি”
নিশ্চয়ই আমরা সফল হবো এই কাজে ।

ফোন রেখে পকেটে ঢুকিয়ে বিস্তর হাসলো রাইদ । ওর পিএ রফিকুল বেশ নম্র ভাবে প্রশ্ন করলো_
“স্যার হাসছেন কেনো?”
রাইদ পিএ’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো_
— আচ্ছা রফিক আমাকে হিরো মনে হয় নাকি ভিলেইন?
— স্যার আপনাকে দু’টোই মনে হয় । কর্মক্ষেত্রে দু’টোই স্যুট করে আপনাকে ।
— আর বাস্তব জীবনে?
— বাস্তবে! স্যার আপনাকে আমি বুঝিনা । বাস্তবেও আপনি দ্বৈত সত্বা নিয়ে চলেন । একবার হিরো মনে হয় একবার ভিলেইন ।
— রফিক তোমাকে আমি কেনো এত পছন্দ করি জানো?
— জানিনা স্যার ।- valobaser golpo
— কারণ তুমি অন্যদের মত হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলাও না । তুমি সবসময় সত্যি কথা বলো । আমি আবার সত্যবাদীদের খুব পছন্দ করি ।
— জ্বী স্যার ।
— বাই দ্য ওয়ে গেট রেডি । সামনে সারপ্রাইজিং কিছু ডে আসতে চলেছে রফিক ।
,
চলবে?

Leave a Comment